আচ্ছা, বলুন তো, বাঙালির মতো এমন রোমান্টিক জাতি আর কটা আছে!
অনেকে বলে ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান – এদের রোমান্টিকতা পৃথিবী বিখ্যাত। সেতো ‘প্রাক্তন’ সিনেমায় প্রসেনজিৎ বলেছেই – প্যারিস হলো ভালোবাসার শহর, আর কলকাতা হলো প্যাশনের।
কিন্তু যে জাতি মেঘলা দিন হলেই কিংবা একটু বৃষ্টি পড়লেই খুশি হয়ে যায়, গুনগুন করে গান গাইতে থাকে, এক কাপ চা বা কফি নিয়ে একসঙ্গে ভাবুক আর উদাসী হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে – তাকে রোমান্টিক বলবো না তো কি?
আর বৃষ্টির পরে ইনস্টাগ্রামের ফিড তো বৃষ্টি ভেজা কলকাতা শহরের রীলে ভরে উঠলে অতি বড় কলকাতার নিন্দুকও এই শহরটার প্রেমে পড়তে বাধ্য।
বৃষ্টি পড়লে বাঙালি কবিতা লেখে, আবৃত্তি করে। বৃষ্টি পড়লে বাঙালি গান গায়। বৃষ্টি পড়লে আবার মনটা ময়ূরের মতো নেচে ওঠে – তা সে নিজে নাচতে না পারলেও মনের তো কোনো বাধা নেই।
এ তো গেল বাঙালির কাব্যিক দিক। আর বর্ষার সঙ্গে বাঙালির পৈটিক যোগ?
বাঙালির বৃষ্টি আর রসনা বিলাস
বাংলার বৃষ্টির দিন, তার সঙ্গে খিচুড়ি বা পেঁয়াজি আর জানালার পাশের গান — এখানেই না আমাদের বাঙালিয়ানা!
বেশ সকাল থেকে গগনে মেঘের ঘনঘটা, অথবা এক নাগাদ বৃষ্টি হয়েই চলেছে। ব্যাস, বাড়িতে বাড়িতে বোল উঠলো “আজকে তো খিচুড়ির দিন”, “আরে, আজ তো খিচুড়ি হবেই!”
বেলার দিকে কখনো বৃষ্টি বাড়ে, কখনো বা বৃষ্টির রেশ কমে এসে ‘টুপটাপ’ পড়তে থাকে। তার সঙ্গে চলে গোবিন্দভোগ চালের সুগন্ধে ভরা খিচুড়ি। সঙ্গে ডিমভাজা-আলুভাজা-পেঁয়াজি। সঙ্গে পাঁপড় ভাজা। আর ঘি মাস্ট। যেদিন বাড়িতে যা থাকে।

অথবা গুড়ু গুড়ু শব্দে মেঘের ঘনঘটা — সঙ্গে জুটে গেল খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা।
কারোর আবার বিকেলের বৃষ্টি মানে পেঁয়াজি-মুড়ি — সঙ্গে একটু সর্ষের তেল ও কাঁচা লঙ্কা। আর সন্ধ্যের দুধ চা টা বাদ থাকে কেন।
বাঙালির কাছে ‘এরই নাম তো জীবন!’
না, এইসব বৃষ্টির দিনের খাদ্য রসিকতার কাছে swiggy-zomato এর ইনস্ট্যান্ট খাবার অর্ডার ম্লান হয়ে যায়। পরেরটায় আরাম আছে, রোমান্টিকতা নেই।
বাঙালির বৃষ্টি ও নস্টালজিয়া
তবে বাঙালির বর্ষা তো শুধু আহারেই সীমিত নয়, এই সঘন সজল ঋতুর আগমন আমাদের সাহিত্য, সংগীত, প্রেম, প্রীতি, বিরহ – সব কিছুর উপরেই প্রভাব ফেলে। আমাদের মনমেজাজ – সেও তো এই বর্ষার জলসিঞ্চনে সজীব হয়ে উঠে।
বৃষ্টি আমাদের নস্টালজিক করে তোলে — মনে পড়ে যায় ছোটবেলায় কাগজের নৌকা বানিয়ে বৃষ্টির জলে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা…
কখনো কখনো বর্ষার ভেজা বাতাসে কদম ফুলের ঘ্রাণ বয়ে আনে কয়েক আলোকবর্ষ আগের ছোটবেলার গন্ধ – যেটা কোথাও হারিয়ে গেছে…
বর্ষায় শহরের-গ্রামের রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়া দেখে মনে পড়ে যায় কোনোদিন স্কুল বা কলেজ থেকে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রাস্তার জলে ছপাক-ছপাক করে বাড়ি ফিরে আসা…
বৃষ্টির ভেজা হাওয়ার সঙ্গে একঝাপটা কদম ফুলের ঘ্রান কোথাও কেন আমাদের সেই পুরোনো দিনগুলোর দিকে ঠেলে দেয়।
বাঙালির বৃষ্টি ও কাব্যপ্রেম
আর বৃষ্টির গান?
বাঙালির তো রবীন্দ্রনাথ আছেই – সুখে, দুঃখে, আদরে, যন্ত্রনায় — সর্বত্র তিনি। ‘‘আজি ঝর ঝর মুখর বাদরদিনে’ থেকে ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’, ‘আমি তখন ছিলেম মগন গহন ঘুমের ঘোরে/ যখন বৃষ্টি নামল…’ রবিঠাকুরের বর্ষার গান তো চতুর্দিকে মণিমুক্তোর মতো ছাড়িয়ে আছে।
গ্রাম বাংলার বৃষ্টির রূপকে জানতে হলে জীবনানন্দ দাশের ‘বর্ষার দিনে’ এক মায়াবী সৃষ্টি।
আর বর্ষার বিরহ? সে আমাদের প্রাণের কবি নজরুল ব্যাতিত কি ভাবে সম্পূর্ণ হয়? ‘শাওনে যাহারে পেলে না, তারে কি ভাদরে পাইবে দেখা?’
আচ্ছা, আমাদের মধ্যে কতজন বৃষ্টির মধ্যে হেমন্ত মুখার্জীর গাওয়া ‘এই মেঘলা দিনে একলা’ গানটা গেয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকি না?
নতুবা ইদানিং কালের শ্রেয়া ঘোষালের গলায় ‘আবছায় জানালার কাঁচ’ লাইনগুলো মনটাকে ভারী রোমান্টিক করে তোলে। গানের লাইনগুলো খুব আপন মনে হয়…
বাঙালির বৃষ্টি ও চলচ্চিত্র
বৃষ্টি সৃষ্টির প্রতীক — তার মধ্যে দিয়ে বাঙালি তার সৃজনশীলতা খুঁজে নেয়। যুগ যুগ ধরে বাংলা চলচ্চিত্রেও বৃষ্টিকে ভারী সুন্দর ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’র আপু-দুর্গার সেই বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য। বৃষ্টি যেন এখানে প্রপ নয়, একটা পূর্ণাঙ্গ চরিত্র।

তারপর মনে পড়ে ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’র সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য — প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে নীতা বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে, শঙ্কর পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তেমনই অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী তাঁর ‘অন্তহীন’ ছবিতে কলকাতা শহরের বৃষ্টিকে দারুন নান্দনিক ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন — যা আপনাকে কলকাতা শহরটার প্রেমে ফেলতে বাধ্য করবে।
সম্প্রতিক কালের বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তালনবমী’ অবলম্বনে পরিচালক মানস মুকুল পাল ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ (২০১৬) তে গোপাল ও ছোটুর বৃষ্টির মধ্যে তাল কুড়োনোর ঘটনাবলি ভারী আন্তরিক।
তালিকা তো কম লম্বা নয় — এই সব ক্ষেত্রেই বর্ষা এবং বৃষ্টি কোনো প্রেক্ষাপট নয়, বরং চরিত্র হিসেবেই পরিচালকরা তুলে ধরেছিলেন।
সত্যি কথা বলতে বর্ষা আর বৃষ্টি নিয়ে আমরা বাঙালি যতই রোমান্টিকতা করি, বাস্তবের দৃশ্যে একটু বেশি বৃষ্টি পড়া মানে জলজমা, কাদা, যানজট — সব কঠিন বাস্তব নিয়ে আছেই। সেটা অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। সে কলকাতা মহানগরই হোক, কোনো শহরতলি, মফস্বল বা গ্রাম। কিন্তু ওই যে — আমরা বাঙালি। সব কিছুর মধ্যেই সৌন্দর্য খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতাই আমাদের এতো রোমান্টিক জাতি করে তুলেছে।
আসলে অঝোরে বৃষ্টি তো শুধু আকাশ থেকেই পড়ে না, আমাদের মনের মধ্যেও পড়ে, আর তার প্রভাব আমাদের চিন্তনে পড়ে।
বছরের বাকি ঋতুগুলোর থেকে বর্ষার সময়টা একটু ধীর গতিতে চলে — এই সময় স্কুল, কলেজ, অফিসে দেরিতে ঢোকাও কিছুটা মঞ্জুর। কেউ হয়তো এমন বৃষ্টির দিনে জল-কাদা পেরিয়ে স্কুল বা অফিসের লেট মার্কিংটা বাঁচাচ্ছে। আবার কেউবা কাজকর্ম ছেড়ে রেইনি ডে-এর মেজাজে পেঁয়াজি, বেগুনি আর গরম চায়ের কাপ নিয়ে জানালার পাশে বসে অঝোরধারায় দিকে তাকিয়ে কোনো সুদূর অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করছে।
আমার কাছে তো বর্ষার বৃষ্টি মানেই নস্টালজিয়া — পুরোনো প্রেমের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া কোনো গানের কলি গুনগুন করে গাওয়া, অনেক বছর আগের মায়ের হাতের খিচুড়ি আর বেগুনি খাবার লোভ। ফ্ল্যাশব্যাকে আরো চলে গেলে, আমার কাছে বৃষ্টি পড়া মানে দাদাদের কলাগাছের ভেলা বানিয়ে হৈহৈ করে পুকুরে ভাসা বা মায়ের আঁচল ধরে মায়ের ওম নেওয়া।
আপনার কাছে বর্ষা মানে কি? আপনি কি ভাবে অঝোরধারার মধ্যে নিজেকে নিজের মতো করে খুঁজে পান — বলুন তো?